
আবারো উচ্ছেদ আতঙ্কে পূর্ব বেতছড়া পাড়ার ত্রিপুরা পরিবার
[caption id="attachment_2367" align="alignleft" width="300"]
আগুনে পুড়িয়ে দেবার পর পার্বত্য উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পূর্ব বেতছড়া পাড়ার নতুন সরকারী ঘর।[/caption]
মো: নজরুল ইসলাম (টিটু), বান্দরবান : বান্দরবানের লামার সরই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব বেতছড়া ত্রিপুরা পাড়ার ১৯টি ত্রিপুরা পরিবারের শনির দশা যেন কাটছেই না। ২০১৯সালের পর থেকে তাদের বসবাসের পাড়া ও জুম চাষের একমাত্র জায়গাটির উপর প্রভাবশালীদের নজর পড়ার পর থেকে একের পর এক বিপদ ঘিরে ধরছে তাদের। এক বিপদ কাটতে না কাটতেই অন্য আরেকটি বিপদ তাদের ঘিরে ধরছে। সম্প্রতি আবারো প্রশাসনের লোকজন গিয়ে জায়গাটির উপর স্কেচ ম্যাপ তৈরির খবরে আবারো উচ্ছেদ আতঙ্কে রয়েছে পাড়ার ১৯টি পরিবারের শতাধিক মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানাযায়, প্রায় ২৫/৩০বছর পূর্বে এ জায়গাটিতে কয়েকটি ভূমিহীন পরিবার স্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করে এবং সেখানেই জুম চাষের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু ২০১৯সালে সাবেক পুলিশ প্রধান আইজিপি বেনজীর আহমেদের নজরে আসে এ জায়গাটি। তখন তিনি স্থানীয় জেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতির মাধ্যমে পাড়াবাসীদের উচ্ছেদের চেষ্ঠা করে। কিন্তু পাড়াবাসীদের সাথে পেরে না উঠতে পারায় একসময় সটকে পড়লেও পরে আবার এলাকার কিছু সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে রাতের আধারে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এবিষয়ে এখনো মামলা চলমান। এমন অবস্থায় গেল বুধবার (৬আগষ্ট) হঠাৎ করে লামা উপজেলা এসিল্যান্ড অফিস থেকে পাড়াবাসীদের কোন ধরনের নোটিশ ছাড়া এবং কোন কিছু না জানিয়ে সার্ভেয়ার মো: মিজান এবং চেইনম্যান মো: নজরুল ইসলাম এলাকার মৌজা প্রধান দূর্যোধন ত্রিপুরাকে সাথে নিয়ে স্বেচ ম্যাপ তৈরি করে নিয়ে আসে। তবে কি কারণে স্বেচ ম্যাপ তৈরি করেছে বিষয়টি পাড়াবাসীদের এখনো স্পষ্ট করে জানানো হয়নি। আর এতে তারা নতুন ভাবে উচ্ছেদ আতঙ্কে রাত্রি যাপন করছে ত্রিপুরা পরিবারগুলো।
পাড়াবাসীরা জানায়, এ পাড়ায় বসবাস করাটা আমাদের জন্য এখন অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ চলে যাবার পর একটু স্বস্তি ফিরে পেয়েছিলাম। কিন্তু আগুন দিয়ে পাড়া পুড়িয়ে দেবার পর সেই স্বস্তি অনেকটা চলে যায়। পার্বত্য উপদেষ্টার আশ্বাসে তখন কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও সম্প্রতি আবারও জেলা প্রশাসন থেকে কোন ধরনের নোটিশ ছাড়া জায়গার স্কেচ ম্যাপ করাটাকে নতুন ভাবে ভাবিয়ে তুলছে আমাদের। তারা বলেন, আমরা বার বার জানতে চেয়েছি কেন স্কেচ ম্যাপ করা হচ্ছে, কিন্তু সবকিছু আমাদের থেকে গোপন করা হচ্ছে। আমরা জানতে চাই আসলে জেলা প্রশাসন এখানে আমাদের সাথে কি করতে চায়। তারা আরো বলেন, আমরা শুনেছি লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ আমাদের এ জায়গাটি রাবার প্লটের জন্য লীজ নিতে চায়। আর তাদের লীজ দেবার জন্য এ স্কেচ ম্যাপ করা হচ্ছে। বিষয়টি আমরা বিভিন্ন মহল থেকে শুনতে পারছি। এসময় তারা বলেন, আগুন দিয়ে পাড়া পুড়িয়ে দেবার পর পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা আমাদের নিজে এসে দেখে গেছেন। তিনি আমাদের সরকারী ভাবে নতুন ঘর নির্মাণ করে দিয়েছেন। উপদেষ্টা আমাদের নিজেই বলেছেন, যেই আসুক এ জায়গা থেকে যেন আমরা কোথাও না যাই। প্রয়োজনে যুদ্ধ করে জীবন দিব, তবু এখান থেকে সরবো না।
এ বিষয়ে পাড়ার সিয়ান্দ্র ত্রিপুরা বলেন, আমাদের কোন ধরনের নোটিশ না দিয়ে প্রশাসন থেকে কেন স্কেচ ম্যাপ করেছে আমরা জানতে চাই। আমাদের থেকে এ বিষয়টি কেন গোপন করা হয়েছে, আমাদের কেন নোটিশের কোন কিছু দেখানো হচ্ছেনা? আমাদের সবকিছু স্পষ্ট করতে হবে।
পাড়ার অজারাম ও তিকরাম ত্রিপুরা বলেন, আমরা বার বার জানতে চাইছি কেন স্কেচ ম্যাপ করা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের কোন সুদুত্তর না দিয়ে উল্টো কাগজপত্র নিয়ে অফিসে দেখা করতে যেতে বলেছে কোন কারণ ছাড়া। নোটিশও দিলনা, শুধু মুখে বলে চলে গেল। আজ ২সপ্তাহ পেরিয়ে গেল, কিন্তু এখনো জায়গার স্কেচ ম্যাপের কারণ সম্পর্কে জানতে পারলাম না।
পাড়ার কারবারী গুঙ্গামনি ত্রিপুরা বলেন, হঠাৎ করে লামা উপজেলা সার্ভেয়ার হেডম্যানকে নিয়ে এসে স্কেচ ম্যাপ করে নিয়ে গেছে। তবে এ ব্যাপারে আমাদের আগে থেকে জানানো হয়নি, কোন নোটিশও দেয়নি। কিন্তু আমরা জেনেছি এ পাড়ার জায়গাটি লীজ দেয়ার পরিকল্পনা চলছে। যদি এমন হয় তবে আমরা আন্দোলনে নামবো। জড়িতদের সবার বিরুদ্ধে আর্ন্তজাতিক ভাবে বিচার চাইবো। এখানেই আমরা মরে যাব, তারপরও সরবো না।
এ বিষয়ে সরই মৌজার হেডম্যান দর্যোধন ত্রিপুরা বলেন, আমাকে সার্ভেয়ার সাথে যেতে বলেছে তাই আমি গিয়েছি। আমি জানতেও চাইনি কেন স্কেচ ম্যাপ করা হচ্ছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি এখনো জানিনা প্রশাসন আসলে কি করতে চাচ্ছে।
লামার রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মো: কামাল উদ্দিন বলেন, আমি নতুন করে কোন লীজের আবেদন করিনি। কেন এসিল্যান্ড সার্ভেয়ার পাঠিয়েছে তাও আমি জানিনা। এ বিষয়টি আসলেআ পাড়াবাসীদের স্পষ্ট করা দরকার। তাহলে তাদের মধ্যে যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে তা চলে যাবে।
[caption id="attachment_2368" align="alignleft" width="300"]
আগুনে পুড়িয়ে দেবার পর পার্বত্য উপদেষ্টার পক্ষ থেকে পূর্ব বেতছড়া পাড়ার নতুন সরকারী ঘর।[/caption]
এ বিষয়ে লামা এসিল্যান্ডের সার্ভেয়ার মো: মিজান জানান, আমাকে এসিল্যান্ড বলেছে, পূর্ব বেতছড়া পাড়ার স্কেচ ম্যাপ এবং পাড়ার প্রতিটি পরিবারের জমির কাগজ সংগ্রহ করার জন্য। আমি এখন স্কেচ ম্যাপ করেছি এবং তাদের কাগজপত্র দিয়ে যেতে বলেছি। এর বিস্তারিত এসিল্যান্ড স্যারই ভাল বলতে পারবেন।
এ বিষয়ে লামার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মঈন উদ্দিন বলেন, আমার থেকে বান্দরবান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থেকে একটি জরুরী চিঠি এসেছে। এটি উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এসেছে, পূর্ব বেতছড়া পাড়ার মালিকানা এবং স্কেচম্যাপ ১সপ্তাহের মধ্যে তৈরি করে পাঠানোর জন্য, কিন্তু কেন চেয়েছে জানিনা। বিস্তারিত অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ভাল বলতে পারবেন।
বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এস. এম. মনজুরুল হক বলেন, উপদেষ্টার দপ্তর থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে পূর্ব বেতছড়া পাড়ার উপর একটি স্কেচম্যাপ করার জন্য। আমরা এটি উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠিয়ে দিব। এতে পাড়াবাসীদের আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। তাদের কিছুই হবেনা। তিনি বলেন, কেন স্কেচম্যাপ করতে বলেছে এটি আমাদের জানানো হয়নি। তবে লামা রাবার ইন্ডাষ্ট্রিজকে লীজ দেবার জন্য এসব করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব কিছুই না।
তবে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে জানিয়েছেন বান্দরবান জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি। তিনি বলেন, বিষয়টি আমি জানিনা। আমি কথা বলে নিশ্চিত হয়ে আপনাকে জানাবো। তবে পাড়াবাসীদের সাথে কোন অন্যায় করা হবেনা এটি নিশ্চিত থাকুন। লীজের ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, বান্দরবানে লীজ এবং বন্দোবস্তি দুটোই বন্ধ আছে। অতএব, এগুলো করারতো প্রশ্নই আসেনা।
উল্লেখ্য , গেল বছরের মঙ্গলবার (২৪ ডিসেম্বর) লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বেতছড়া ত্রিপুরা পাড়ায় দিবাগত রাত ১টার দিকে পাড়ার বাসিন্দারা বড়দিনের উৎসব পালন করতে পাশের এলাকায় যায়। এসময় মধ্যরাতে হঠাৎ পাড়ার বাড়িঘরে আগুন দেখতে পান। সেখানে গিয়ে দেখেন তাদের পুরো পাড়া পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এঘটনার খবর পেয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) বিকালে অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার ত্রিপুরা খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এর আগে সাবেক পুলিশ প্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমদ এ জায়গাটি পাড়াবাসীদের সরিয়ে দখলে নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।