দেড় মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পানি সংগ্রহ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান এলাকাবাসী
মথি ত্রিপুরা, বিশেষ প্রতিনিধি:
শত বছর পেরিয়ে গেলেও বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম ১ নং ওয়ার্ড আদিগা পাড়ায় সুপেয় পানির সংকট কাটেনি। প্রতিদিন দেড় মাইল পর্যন্ত দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে গভীর ঝিরি থেকে ঝুঁকি নিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে পাড়াবাসীকে । নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই পানি সংগ্রহ যেন নিত্যদিনের এক কঠিন সংগ্রাম।
গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে আদিগা পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সুপেয় পানির জন্য হাহাকার করছেন গ্রামবাসী। পাড়াটিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার, স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন ২০০ থেকে ৩০০ মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করলেও এখনো সেখানে নিরাপদ ও সহজলভ্য সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাড়ার কাছাকাছি নিরাপদ পানির উৎস না থাকায় প্রায় এক থেকে দেড় মাইল দূরের একটি গভীর পাহাড়ি ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ, পিচ্ছিল ঢাল ও দুর্গম রাস্তা পেরিয়ে ভারী পানির পাত্র বহন করে পাড়ায় ফিরতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারীরা।
বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভারী বৃষ্টিতে ঝিরির পানি ঘোলা হয়ে গেলেও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে সেই পানি সংগ্রহ ও ব্যবহার করতে হয়। ফলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা তৃনা ত্রিপুরা বলেন, আমাদের পাড়ার পানি সংগ্রহের জায়গাটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। পাড়া থেকে অনেক দূর হেঁটে গিয়ে পানি নিয়ে আসতে হয়। রাস্তা অনেক পিচ্ছিল। অনেক সময় পা পিছলে পড়ে গিয়ে মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ঘটনাও ঘটে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের জন্য ঝুঁকি বেশি। বর্ষাকালে সুপেয় পানির জন্য আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়।
আরেক বাসিন্দা ছবি ত্রিপুরা বলেন, পানি আনতে গেলে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এর সঙ্গে কাপড়-চোপড়, হাঁড়ি-পাতিল ও থালা-বাসন ধুতে গেলে আরও বেশি সময় লাগে। পানি তোলার জায়গাটিও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময় পাহাড় উপর থেকে পাথর গড়িয়ে নিচে পড়ে। ভাগ্য ভালো যে, এখনো কারও গায়ে পড়েনি। সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে আমাদের জোর দাবি, আদিগা পাড়ার সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
প্রশান্ত ত্রিপুরা জানান, গত বছর পানি সংগ্রহের সময় পাহাড়ি পথ মই দিয়ে ওঠানামা করতে গিয়ে এক নারী পড়ে গিয়ে আহত হন। স্কুলপড়ুয়া ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাও মই সিঁড়ি দিয়ে চলাচলের সময় পড়ে যায়। বর্ষাকালে অতিবৃষ্টিতে ঝিরির পানি ঘোলা হয়ে যায়। কিন্তু কোনো বিকল্প না থাকায় সেই পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে হয়। এতে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আদিগা পাড়ার কারবারি লুসিয়ান ত্রিপুরা বলেন, এই পাড়াটি অনেক বছরের পুরোনো। আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ বছর ধরে এখানে মানুষ বসবাস করছে। কিন্তু এত বছর হয়ে গেল, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। পাড়ায় সুবিধাজনক একটি পানি সরবরাহের লাইন করে দেওয়া হলে এলাকা গ্রামবাসীদের অনেক উপকার হবে। বিশেষ করে নারীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমবে।
এদিকে আদিগা পাড়ার সুপেয় পানির সংকটের বিষয়টি অবগত হওয়ার কথা জানিয়েছেন রুমা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী সঞ্জীব বড়ুয়া। মুঠোফোনে তিনি বলেন, আদিগা পাড়ার সুপেয় পানির সংকটের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। আমরাও চেষ্টা করছি। সামনে প্রকল্প বা বাজেট এলে সেখানে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রথমে আমরা সেখানে সরেজমিনে তদারকির জন্য যাব। এরপর গভীর নলকূপ (ডিপ ওয়েল) অথবা সরবরাহ লাইন করার বিষয়ে চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে আদিগা পাড়ার সুপেয় পানির সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে দীর্ঘদিনের এই সংকট কবে নাগাদ নিরসন হবে, সেই অপেক্ষায় রয়েছেন আদিগা পাড়ার বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, দুর্গম এই পাহাড়ি জনপদের মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার নিরাপদ ও সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।