শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা, সামনে নবান্ন উৎসব। দেড় মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে পানি সংগ্রহ, প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চান এলাকাবাসী। ফিজিওথেরাপি সেবার মানোন্নয়ন ও বাংলাদেশ রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল আইন-২০১৮ বাস্তবায়নের দাবি। সরাইলে শাহজাদাপুর ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে মাদকবিরোধী র‍্যালি ও সমাবেশ, রুমায় সম্প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন ত্রিপুরা উড্ডয়ন স্পোর্টিং ক্লাব শিক্ষকদের সাথে অসদাচরণের অভিযোগে রামদু পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা কর্মকর্তার তদন্ত ও পরিদর্শন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে জমি নিয়ে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ৫৩ বছরের পথচলা উদ্‌যাপনে অরিন্দমের চার দিনের আয়োজন বান্দরবানের ৬নং ওয়ার্ডের সমাজসেবক মহিউদ্দিনের পিতার ইন্তেকাল। সরাইলে শ্রীকৃষ্ণের শুভ জন্মাষ্টমী মহোৎসব: বিশ্বশান্তি কল্পে বর্ণাঢ্য আনন্দময় শোভাযাত্রা,

জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা, সামনে নবান্ন উৎসব।

Reporter Name / ৮ Time View
Update : শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জুমের ধান কাটায় ব্যস্ত জুমিয়ারা, সামনে নবান্ন উৎসব

মথি ত্রিপুরা, বিশেষ প্রতিনিধি:
পাহাড়ের সবুজ বুকজুড়ে এখন ছড়িয়ে পড়েছে পাকা ধানের সোনালি রং। ঢালু পাহাড়ের জুমক্ষেতে দুলছে পাকা ধানের শীষ, আর সেই ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমচাষীরা। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে ফলানো বছরের কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তোলার আনন্দে বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলার দুর্গম জনপদে এখন চলছে জুমের ধান কাটার উৎসবমুখর ব্যস্ততা।

চলতি মৌসুমে সময়মতো পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় জুমের ফলন গতবারের তুলনায় ভালো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জুমিয়ারা । বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদের বিভিন্ন পাড়া ঘুরে দেখা গেছে, পরিবারের সদস্য ও শ্রমিকদের নিয়ে জুমচাষীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাকা ধান কাটায়। ধান কাটার পাশাপাশি কেউ কেউ জুম থেকে মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, চিনাল, বেগুন, কচু, আদা ও তিলসহ বিভিন্ন সাথি ফসলও সংগ্রহ করছেন।

রুমা উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের জৈতুন পাড়ার স্থানীয় জুমচাষী জুবিরাং ত্রিপুরা জানান, চলতি বছর তিনি প্রায় চার থেকে পাঁচ একর পাহাড়ি জমিতে জুম চাষ করেছেন। এবার তাঁর জুমে প্রায় ১৫০ আড়ি ধান পাওয়ার আশা করছেন। তিনি বলেন, জুমে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, চিনাল, বেগুন, আদা ও তিলসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা যায়। তিলকে জুমচাষীরা ধানের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল হিসেবে বিবেচনা করেন। বছর শেষে তিল, আদা ও হলুদ সংগ্রহ করা হবে। অনেক জুমচাষী তুলাও চাষ করে থাকেন।

আদিগা পাড়ার বাসিন্দা যোয়াকিম ত্রিপুরা জানান, বিন্নি ধানসহ তিনি চলতি মৌসুমে প্রায় তিন একর জমিতে জুমের ধান চাষ করেছেন। এর পাশাপাশি কচু, তিল, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, চিনাল ও বেগুনসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেছেন। এবার তাঁর জুমে প্রায় ১২০ আড়ি ধান পাওয়ার আশা রয়েছে। তিনি বলেন, এ বছর আবহাওয়া তুলনামূলক ভালো ছিল। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই তিনি জুমের পাকা ধান কাটা শুরু করেছেন।

জুমচাষী তিমথি ত্রিপুরা বলেন, জুম আমাদের আদিকাল থেকে চলে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতি। এটি আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। ধান চাষের ক্ষেত্রে জুম ছাড়া আমাদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প নেই। প্রতিবছরই আমাদের জুম চাষ করতে হয়। তিনি জানান, জুমে একই জমিতে ধানের পাশাপাশি মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা, মারফা, চিনাল, বেগুন, আদা ও তিলসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করা যায়। একটি জুমের জায়গা থেকেই প্রায় ১২ ধরনের ফসল পাওয়া যায়। চলতি বছর তিনি চার একর জমিতে ধান চাষ করেছেন এবং প্রায় ১৩০ আড়ি ধান পাওয়ার আশা করছেন।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুম চাষের আবাদ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলার ৮ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে জুম আবাদ করা হয়। ওই বছর উৎপাদন হয় ১০ হাজার ৪৮৯ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জুমের আবাদ কমে দাঁড়ায় ৮ হাজার ২৬৭ হেক্টরে। এ বছর চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৪৯৯ দশমিক ৪১ মেট্রিক টন। অন্যদিকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুমের আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৮৯৫ হেক্টরে। এ বছর ১৩ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৯৩ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ তৌফিক আহমেদ নূর জানান, জেলার রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি ও আলীকদম উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ইতোমধ্যে জুমের ধান কাটা শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য উপজেলাতেও ধান কাটা শুরু হবে।
তিনি বলেন, স্থানীয় জাতের ধানের পাশাপাশি জুমচাষীদের উন্নত ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষেও উৎসাহিত করছে কৃষি বিভাগ।

পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরজুড়ে চলবে পাকা জুমের ধান কাটার কাজ। ধান কাটার পর মাড়াই ও শুকানোর ব্যস্ততাও থাকবে পুরোপুরি। এরপর নতুন ফসল ঘরে তোলার পর নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের পাহাড়ি জনপদের ঘরে ঘরে শুরু হবে নতুন ধানের চাল দিয়ে নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির আয়োজন। বিশেষ করে ডিসেম্বর মাসের ২৫ তারিখে খ্রিস্টান ধর্মালম্বীরা, যীশু খ্রিস্টের জন্ম উৎসবকে কেন্দ্র করে নতুন ধান ও নতুন বিন্নি চাউল দিয়ে নবান্ন উৎসব ও পিঠা উৎসব আয়োজন করা হবে ।

নতুন ফসল ঘরে তোলার আনন্দকে ঘিরে পাহাড়ের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় আয়োজন করা হবে জুমের ধানের নবান্ন উৎসব। নতুন ধানের ঘ্রাণ, সোনালি শিষ আর আনন্দ-উৎসবে তখন মুখর হয়ে উঠবে পাহাড়ি জনপদ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে উৎসবের আমেজ, মিলবে পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণবন্ত ছোঁয়া।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category