পাড়ায় ফিরছে বম পরিবার, খাদ্য-ঘর-জীবিকায় সহায়তা দিচ্ছে সেনাবাহিনী
মথি ত্রিপুরা, বিশেষ প্রতিনিধি
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় ২০২৪ সালের নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া বম সম্প্রদায়ের পরিবারগুলো ধীরে ধীরে নিজ পাড়া ও বসতভিটায় ফিরতে শুরু করেছে। ফিরে আসা এসব পরিবারের পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে রুমা জোনের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাদ্যসামগ্রী, আর্থিক সহায়তা, ঘর মেরামতের উপকরণসহ বিভিন্ন ধরনের মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে রুমার বিভিন্ন পাড়ার বেশ কিছু পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় তারা পর্যায়ক্রমে নিজ পাড়া ও বসতভিটায় ফিরে আসছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন পাড়ায় ফিরে আসা ৬৮টি পরিবারকে পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পরিবারকে রেশন, নগদ অর্থ, ঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিন, সোলার সামগ্রী, ফলজ গাছের চারা ও জীবিকা নির্বাহের উপকরণ দেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মিজোরাম থেকে রুমার দার্জিলিং পাড়ায় ফিরে এসেছে বম সম্প্রদায়ের একটি পরিবার। পরিবারের সদস্য মালমিন সাম বম (৩০), জিংনিজুয়াল বম (২৯) ও তাদের সন্তান রামথার ইয়াক বম দীর্ঘদিন মিজোরামে অবস্থানের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় নিজ পাড়ায় ফিরে এসে বসতি স্থাপন করেছেন।
পরিবারটির পুনর্বাসনে রুমা জোনের পক্ষ থেকে ৫০ কেজি চাল, ৫ কেজি ডাল, ৫ কেজি তেল, ৫ কেজি লবণ, ৫ কেজি আলু ও ৫ কেজি পেঁয়াজসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বসতঘর মেরামতের জন্য তিন বান্ডিল ঢেউটিন, একটি সোলার প্যানেল ও ১৫ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।
এদিকে মিজোরাম থেকে নাজেরাত পাড়ায় ফিরে এসেছে বম সম্প্রদায়ের পাঁচ সদস্যের আরেকটি পরিবার। পরিবারের সদস্যরা হলেন লাল সান ঙাক বম, ভান ঠুয়াই কিম বম, জেনদির বম (১২), উডেন বম (১০) ও মারকাজ বম (৬)। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিজ পাড়া ছেড়ে মিজোরামে আশ্রয় নেওয়া পরিবারটি সম্প্রতি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় নিজ পাড়ায় ফিরে আসে।
ফিরে আসা পরিবারটিকে এক মাসের রেশন হিসেবে ৭২ কেজি চাল, ১২ কেজি ডাল, ১২ কেজি তেল, ১০ কেজি চিনি ও এক কেজি চা-পাতা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বসতঘর মেরামতের জন্য তিন বান্ডিল ঢেউটিন এবং ৩০টি ফলজ গাছের চারা দেওয়া হয়। পরিবারের শিশুদের শিক্ষাজীবন পুনরায় শুরু করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর আগে মিজোরাম থেকে মুলফি পাড়ায় ফিরে আসা জিং এং পার বম, পিতা লাল জার লম বমের পরিবারকেও ধাপে ধাপে পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রত্যাবর্তনের পর তাকে ২০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা ও ৩০ দিনের রেশন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বসতঘর মেরামতের জন্য ঢেউটিন এবং পরিবারের নারী সদস্যকে স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে একটি সেলাই মেশিন দেওয়া হয়েছে।
রুমা জোনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন পাড়ার বাইরে অবস্থানের কারণে অনেক পরিবারের বসতঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা, বসতঘর সংস্কার, শিশুদের শিক্ষা এবং জীবিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে পরিবারগুলো নিজ পাড়ায় থেকে স্বাভাবিক ও স্বাবলম্বী জীবনযাপনের সুযোগ পাচ্ছে।
মিজোরাম থেকে নিজ পাড়া ও বসতভিটায় ফিরে আসতে ইচ্ছুক পরিবারগুলোর নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে রুমা জোন। পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে এ ধরনের মানবিক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়েছে।