দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান: স্বদেশে ফিরে প্রথমবার বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে বম শিশুদের আবেগঘন মুহূর্ত।
বান্দরবান (থানচি) প্রতিনিধি :
বান্দরবান, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬: দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের অনিশ্চয়তা, বাস্তুচ্যুত জীবন ও স্বদেশে ফেরার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নিজ জন্মভূমিতে ফিরেছে বম জনগোষ্ঠীর তিনটি পরিবার। স্বদেশের মাটিতে পা রেখেই বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে তুলে নেওয়ার আবেগঘন মুহূর্তে তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, গর্ব এবং আপন ভূমিতে ফিরে আসার গভীর আবেগ।
পরিবারগুলোর শিশুদের জন্য মুহূর্তটি ছিল আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। তাদের কেউ কেউ এতটাই অল্প বয়সে দেশ ছেড়েছিল যে বাংলাদেশের কোনো স্মৃতিই তাদের মনে নেই। এমনকি একটি শিশুর জন্মও হয়েছে ভারতের মিজোরামে। তাদের কাছে বাংলাদেশ ছিল শুধু বাবা-মায়ের মুখে শোনা এক স্বদেশ, যার সঙ্গে তাদের শিকড় ও আত্মপরিচয় জড়িয়ে ছিল, কিন্তু যাকে তারা কখনো দেখেনি। তাই জীবনের প্রথমবার নিজের দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে তুলে নেওয়ার মুহূর্তটি তাদের জন্য হয়ে ওঠে এক অবর্ণনীয় আবেগের অভিজ্ঞতা। যেন বহুদিনের অচেনা এক স্বদেশ হঠাৎ করেই হয়ে উঠল আপন ঠিকানা।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে বম জনগোষ্ঠীর তিনটি পরিবার স্বদেশ ছেড়ে ভারতের মিজোরামে আশ্রয় নেয়। নিরাপদ আশ্রয়ের প্রত্যাশায় দেশ ছাড়লেও সেখানে তাদের জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় তারা নিজ জন্মভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় জীবনযাপন করে।
পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বম জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও জীবনমান উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে বিভিন্ন মাধ্যমে মিজোরামে অবস্থানরত পরিবারগুলোর কাছে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও নিরাপদে ফিরে আসার বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বম সমাজের সহযোগিতায় এ উদ্যোগের ফলে পরিবারগুলো আস্থা ফিরে পেয়ে স্বদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে তারা মিজোরাম-হরিণা-রাঙামাটি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরদিন ১৩ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে তাদের রাঙামাটি থেকে বাকলাইপাড়া সাব-জোনের আওতাধীন এলাকায় নিয়ে আসা হয়। বাকলাইপাড়া ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয় এবং পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও আশ্বাস প্রদান করা হয়।
ফিরে আসা পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও জীবনযাত্রাকে সহজ করতে বাকলাইপাড়া সাব-জোনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা হিসেবে প্রতিটি পরিবারকে শুকনো রশদ, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রি এবং সোলার প্যানেল ও ব্যাটারী প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠনে ভবিষ্যতেও সার্বিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বম পরিবারগুলোর এই প্রত্যাবর্তন কেবল তিনটি পরিবারের ঘরে ফেরার ঘটনা নয়; এটি স্বদেশের প্রতি মানুষের অটুট টান, নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনের প্রত্যাশা এবং পারস্পরিক আস্থার এক মানবিক প্রতিচ্ছবি। বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার দিন পেরিয়ে আজ তারা ফিরে এসেছে তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে—হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, আর হৃদয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার প্রত্যয়।