মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ, ব্যাহত হ‌চ্ছে উন্নয়ন কাজ; ইট কিনতে বাড়তি টাকা গুনছেন বান্দরবানবাসী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানবাধিকার রক্ষা ও সচেতনতায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান, এইচআরডিএসের প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে আন্তর্জাতিক তিনটি অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন ড. শহীদ উজ জামান। নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়ন শীর্ষক আলোচনা সভা ও স্বপ্নজয়ী নারী সম্মাননা ২০২৬ প্রদান অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত। বান্দরবান প্রেসক্লাবের সার্বিক উন্নয়নে সহযোগিতার আশ্বাস সাচিংপ্রু জেরীর চন্দনাইশ বরমায় সমাজসেবক রঞ্জিত দেবের পরলোকগমন। সালথায় সাংবাদিকদের সাথে নবগঠিত উপজেলা যুবদলের মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত। চট্টগ্রামের বন্দর থানা এলাকা থেকে কিশোরী নিখোঁজ, থানায় জিডি বান্দরবান প্রেসক্লাব দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন- ২০২৬: সভাপ‌তি- ‌মো: না‌ছিরুল আলম, সম্পাদক- এন এ জা‌কির সরাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত আহত ১৫,

বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ, ব্যাহত হ‌চ্ছে উন্নয়ন কাজ; ইট কিনতে বাড়তি টাকা গুনছেন বান্দরবানবাসী

Reporter Name / ২৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

বান্দরবানে ইটভাটা বন্ধ, ব্যাহত হ‌চ্ছে উন্নয়ন কাজ; ইট কিনতে বাড়তি টাকা গুনছেন বান্দরবানবাসী

বান্দরবান প্রতিনিধি, ০৩ ন‌ভেম্বর২০২৬: পাহাড়, বন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত পার্বত্য জেলা বান্দরবান। পর্যটন, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা থাকলেও নির্মাণসামগ্রীর সংকট, বাড়তি ব্যয় এবং কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে জেলায় ইটভাটা স্থাপনের অনুমতি না থাকায় উন্নয়ন ও নির্মাণকাজে এক ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন, দেশের অন্যান্য জেলায় ইটভাটা থাকলেও বান্দরবানে কেন থাকবে না? পরিবেশ সংরক্ষণ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে নির্দিষ্ট নিয়মনীতি ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ইটভাটা স্থাপনের সুযোগ কি তৈরি করা সম্ভব নয়?

অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান সদর উপজেলার সোয়ালক, মাঝেরপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে পাহাড়ের মাটি ও গাছ সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, কেরানীহাটসহ বিভিন্ন এলাকার ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে বান্দরবানের পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। অথচ সেই এলাকার উৎপাদিত ইটই আবার বেশি দামে কিনে বান্দরবানে আনতে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এতে প্রশ্ন উঠছে বান্দরবানে ইটভাটা না থাকার ফলে পরিবেশের প্রকৃত সুরক্ষা কতটুকু নিশ্চিত হচ্ছে? যদি পাহাড়ের মাটি ও গাছ অন্য জেলায় গিয়ে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এই নিষেধাজ্ঞার সুফল পাচ্ছে কারা, আর ক্ষতির বোঝা বহন করছে কারা?

বান্দরবান সদর থেকে শুরু করে রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামা জেলার প্রতিটি উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগত বাড়িঘর নির্মাণে ইটের প্রয়োজন রয়েছে।

কিন্তু স্থানীয়ভাবে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা না থাকায় বাইরের জেলা থেকে ইট সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ সংকট ও বাজারমূল্যের কারণে নির্মাণকাজে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এতে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাড়িঘর নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের মতে, বান্দরবানের ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাইরে থেকে নির্মাণ সামগ্রী পরিবহন করাও ব্যয়বহুল। এ অবস্থায় পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি নির্ভর স্থানীয় ইট উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে নির্মাণ খরচ কমানোর পাশাপাশি জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইটভাটা শুধু ইট উৎপাদনের জায়গা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য মানুষের জীবিকা। শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, মাটি সরবরাহকারী, গাড়িচালক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয় এই খাতকে ঘিরে।

স্থানীয়ভাবে ইটভাটা না থাকায় এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। একসময় যারা এ ধরনের কাজে যুক্ত ছিলেন, তাদের অনেকেই বেকার সময় পার করছে না হয় অনৈতিক কাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

তাদের মতে, বান্দরবানের প্রতিটি উপজেলায় পরিকল্পিতভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। পরিবেশের ক্ষতি না করে নিয়ন্ত্রিত ইট উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করা গেলে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের দ্বার খুলতে পারে।

লামা উপজেলার বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম বলেন, “নিজের বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে বাইরে থেকে ইট আনতে হয়। ইটের দাম, গাড়িভাড়া ও শ্রমিকের খরচ মিলিয়ে নির্মাণব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বান্দরবানে যদি পরিবেশের ক্ষতি না করে নিয়ম মেনে ইট উৎপাদনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।”

শ্রমিক বজলুল রশিদ বলেন, “কাজের সুযোগ থাকলে এলাকার মানুষকে বাইরে গিয়ে কাজ করতে হতো না। ইটভাটা চালু হলে শ্রমিক, গাড়িচালক ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো কাজ আমরা চাই না।”

রুমা উপজেলার মংক্যাচিং মারমার ভাষ্য, “আমাদের এলাকায় উন্নয়নকাজের পাশাপাশি মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণেও ইটের প্রয়োজন হয়। দূর থেকে ইট আনতে গিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়। পরিবেশ রক্ষা করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে পাহাড়ি এলাকার মানুষের জন্য ভালো হতো।”

বান্দরবানের স্থানীয় ব্যবসায়ী নোমান বলেন, “বান্দরবানে নির্মাণকাজের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু ইটের জন্য বাইরের জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সরবরাহ ও দামের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যেও গতি আসবে।”

বান্দরবানের উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে একদিকে যেমন পরিবেশ সংরক্ষণ জরুরি, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, নির্মাণ সামগ্রীর সহজ লভ্যতা এবং জীবন যাত্রার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় জনগণের সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। জেলার কোন এলাকায় পরিবেশগত ঝুঁকি কম, কোথায় শিল্প স্থাপন করা সম্ভব এবং কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—এসব বিষয় বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

বান্দরবান সদর, রুমা, থানচি, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি ও লামাসহ পুরো জেলার উন্নয়নের স্বার্থে স্থানীয়ভাবে নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে।

পরিবেশ রক্ষার নামে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের সম্ভাবনা যেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে না যায়, আবার উন্নয়নের নামে পাহাড়-প্রকৃতিও যেন ধ্বংস না হয় এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বান্দরবানবাসীর প্রত্যাশা, পাহাড় থাকবে, পরিবেশও বাঁচবে; পাশাপাশি গড়ে উঠবে কর্মসংস্থান ও উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category